আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।
আব্দুর রাকিব নাদভী
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আব্দুর রাকিব নাদভী
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন:
كُنتُم خَيرَ أُمَّةٍ أُخرِجَت لِلنّاسِ تَأمُرونَ بِالمَعروفِ وَتَنهَونَ عَنِ المُنكَرِ وَتُؤمِنونَ بِاللَّهِ ۗ وَلَو ءامَنَ أَهلُ الكِتٰبِ لَكانَ خَيرًا لَهُم ۚ مِنهُمُ المُؤمِنونَ وَأَكثَرُهُمُ الفٰسِقونَ
অর্থাৎ: তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর আহলে-কিতাবরা যদি ঈমান আনতো, তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হতো। তাদের মধ্যে কিছু তো রয়েছে ঈমানদার আর অধিকাংশই হলো পাপাচারী। (সূরা আল ইমরান-১১০)
পবিত্র আল কুরআনের উক্ত আয়াতে মুসলমানদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে । এবং শ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়ার কারণসমূহ বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। উম্মত যদি উক্ত আয়াতে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী দ্বারা সজ্জিত হয়, তবে এটি শ্রেষ্ঠ ও উত্তম উম্মত বলে বিবেচিত থাকবে, অন্যথায় উম্মত তার বিশেষত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে যেতে পারে।
মুসলিম উম্মাহ সমগ্র মানবতার হিতৈষী ও শুভাকাঙ্খী হয়ে এসেছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ মুসলিমদের অবস্থা খুব দুঃখজনক, আজ আমরা নিজেরাই ইসলামী বিধি বিধান এমনকি ফরজ ও ওয়াজিবাত থেকে দূরে চলে যাচ্ছি, আমাদের কাছে ইবাদতের কোনো গুরুত্ব নেই, ইবাদতের আধ্যাত্মিকতার অভাব রয়েছে, ইবাদতের পরিবর্তে অপকর্ম আমাদের জীবন ও সমাজে স্থান করে নিয়েছে। আজ আমাদের অবস্থা এমন যে, আমরা অন্যের কাছ থেকে কল্যাণের সীমাহীন আশা রাখি, কিন্তু দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে এতটাই উদাসীন হয়ে পড়েছি যে এই কথাটি আমাদের মন থেকে প্রায় চলে গেছে যে আমাদের অন্যদের চেয়ে বেশি দায়িত্ব রয়েছে কিন্তু আমরা আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। ভাল কাজ আছে, কিন্তু মনে হয় ভাল কাজ আমাদের জীবনের বাইরে। এর একটি ছোট্ট উদাহরণ: রমজান মাস পার হওয়ার পর আমরা আমাদের রবের নিকট থেকে আগের তুলনায় অনেক দূরে। ইবাদতের অবস্থা এমন যে, ঈদের দিনেও আমরা দুনিয়ার কাজে এতটাই মগ্ন যে, ঈদুল ফিতরের দিনও আমরা নামাজের সঠিক সময়ে ঈদগাহে উপস্থিত হয় না।
একজন মানুষের জীবনে শেষ মূল্যবান জিনিস হলো আশা। আশা হারানোর পর শুধু হতাশা থেকে যায়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন পবিত্র আল-কুরআনের একাধিক জায়গায় তাঁর বান্দাদেরকে হতাশা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
قُل يٰعِبادِىَ الَّذينَ أَسرَفوا عَلىٰ أَنفُسِهِم لا تَقنَطوا مِن رَحمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغفِرُ الذُّنوبَ جَميعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الغَفورُ الرَّحيمُ
অর্থাৎ: বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা যুমার আয়াত নং ৫৩)
মানুষের ধারণা যে, সে তার জীবনে একাধিক অপরাধের পর অপরাধ করেছে। আল্লাহর নাফরমানি করেছে, এবং আল্লাহর অধিকার আদায়ে দায়িত্বহীনতার প্রমাণ দিয়েছে, তার কোন ক্ষমা নেই, কেমনে তাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন? কিন্তু মানুষের এই চিন্তা সম্পূর্ণ ভুল। আল্লাহর রহমত অত্যন্ত প্রশস্ত।
এর অর্থ এই নয় যে মানুষ আল্লাহর প্রশস্ত রহমতের আশায় পাপের পর পাপ এবং অপরাধের পর অপরাধে লিপ্ত হবে। এটা একটা বড় প্রতারণা, ধোঁকা এবং আল্লাহর রহমত থেকে আশার পরিপন্থী চিন্তা ধারা। সমাজ যদি এই ধরনের চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্যে লিপ্ত হয়, তাহলে সমাজ ভিত্তিহীন আশার জলাবদ্ধতায় ডুবে যাবে। বর্তমান সমাজ এই ধরনের ভিত্তিহীন আসার ফলে সমগ্র মানব জাতি প্রতারিত হতে চলেছে। এবং সফলতার পথ থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে যাবে।
বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহ দিশাহীনতার স্বীকার, কোরআন-হাদিসকে জীবনের সব ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে না বাস্তবায়ন করে কিছু ভিত্তিহীন আশার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে। এমতাবস্থায় মুসলিম উম্মাহর কাছ থেকে কী আশা করা যায়?, যে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন?
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৃথিবীর পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে আমাদের অনুকূলে করার জন্য আমাদের করণীয়:-নিজের পালনকর্তাকে চিনা, তার বিধি-বিধান কে মেনে জীবন যাপন করা, সালাত প্রতিষ্ঠা করা, সকাল সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া পাঠ করা, বেশি বেশি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা , এবং সালাফে সালেহীনদের জীবনধারা অবলম্বন করার চেষ্টা করা। আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া। হতাশ ও হতাশা কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং নিরাশ মানুষকে ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যায়, অসুবিধা ও প্রতিকূলতায় ভীত না হয়ে এর সমাধান খুঁজতে হবে, পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান ইসলামী শরীয়তে নেই। শর্ত হলো পবিত্র আল-কোরআন ও সহীহ হাদিসের শিক্ষা নিঃস্বার্থভাবে, আবেগ ও সততার সাথে গ্রহণ করা। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সমগ্র মানবতার কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার সংকল্প করুন এবং মিথ্যা আশা এড়িয়ে চলুন যা আমাদের সাথে কেবলমাত্র প্রতারণা করে এবং অন্ধকারে ঠেলে দেই। বিশেষ ওসিয়ত, দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ো না, অন্তরে মানবতার দরদ বহন করো, সৎ আচারণ সৎকর্ম , সেবা ও সৃষ্টি থেকে বিমুখ হয়ো না। কাজ, কথা ও আচার থেকে দূরত্বই আল্লাহর রহমত থেকে নিঃস্ব ও বঞ্চিত হওয়ার প্রকৃত কারণ ও চিহ্ন। এজন্যেই আজকে পৃথিবীর সব স্তরেই যেমন:- অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, পার্থিব, শিক্ষাগত ও অনৈতিক কাজে আল্লাহর রহমত বৃথা যাচ্ছে।
আমাদের উচিত আমরা আল্লাহর রহমতে সুশোভিত ও অধিকারী হই এবং তাঁর প্রতিদানের প্রার্থী হয়ে জীবনের সকল মূহুর্তে সফল হই। হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে তৌফিক প্রদান কর। আমীন।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0