শির্কের উৎপত্তির ইতিহাস
পৃথিবীতে শিরকের উৎপত্তি: তাওহীদ থেকে বিচ্যুতির ইতিহাস।
লেখক: আব্দুর রাকিব নাদভী
ভূমিকা:
মানবজাতির ইতিহাসের সূচনা তাওহীদের ভিত্তিতে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য। কিন্তু কালের পরিক্রমায় মানুষ সেই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে শিরকের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। শিরক—অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা—মানব ইতিহাসের প্রথম ও প্রধান বিভ্রান্তি। এই প্রবন্ধে আমরা কুরআন-সুন্নাহ ও তাফসীরের আলোকে পৃথিবীতে শিরকের উৎপত্তি বিশ্লেষণ করব।
১. আদিম মানবসমাজ: তাওহীদের যুগ:
আদম আলাইহিস সালাম ছিলেন প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী। তিনি তাঁর সন্তানদের তাওহীদের শিক্ষা দেন। সহীহ বর্ণনায় এসেছে—আদম (আ.) ও নূহ আলাইহিস সালাম–এর মাঝে দশ প্রজন্ম ছিল, এবং তাঁরা সবাই একত্ববাদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
عَنِ ابْنِ عَبّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُما، قالَ: «كان بيْنَ نوحٍ وآدَمَ عَشَرةُ قُرونٍ كلُّهم على شَريعةٍ منَ الحقِّ، فاختَلَفوا، فبعَثَ اللهُ النَّبيِّينَ مُبشِّرينَ ومُنذِرينَ، قالَ: وكذلك في قِراءةِ عبدِ اللهِ: ﴿كانَ النّاسُ أُمَّةً واحِدَةً فاخْتَلَفُوا﴾ [البقرة: ٢١٣]
الراوي: عكرمة • الحاكم، المستدرك على الصحيحين (٤٠٥٧) • صحيح على شرط البخاري • أخرجه البزار كما في ((كشف الأستار)) للهيثمي (٢١٩٠) باختلاف يسير، وابن أبي حاتم في ((التفسير)) (١٥١٨٤)، وابن عساكر في ((تاريخ دمشق)) (٦٢/ ٢٤٢) كلاهما ببعض لفظه.
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে মানবসভ্যতার সূচনায় কোনো মূর্তি-পূজা বা শিরক ছিল না; বরং বিশুদ্ধ তাওহীদই ছিল মানবধর্মের মূল ভিত্তি।
২. শিরকের সূচনার পটভূমি: পবিত্র আল কুরআনের সূরা নূহে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقالوا لا تَذَرُنَّ ءالِهَتَكُم وَلا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلا سُواعًا وَلا يَغوثَ وَيَعوقَ وَنَسرًا
তারা বলেছিল “তোমরা তোমাদের উপাস্যদের ত্যাগ করো না—ওয়াদ্দ, সুওয়া‘, ইয়াগূস, ইয়াউক ও নাসরকে ছেড়ে দিও না।” (সূরা নূহ আয়াত:২৩)।
মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন—
এগুলো ছিল নেক ও সৎ ব্যক্তিদের নাম। তাঁদের মৃত্যুর পর মানুষ তাদের স্মরণে মূর্তি নির্মাণ করে।
প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল স্মরণ ও অনুপ্রেরণা গ্রহণ।কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম সেই মূর্তিগুলোকেই ইবাদতের বস্তুতে পরিণত করে। এভাবেই শয়তানের কৌশলে “অতিরিক্ত সম্মান” ধীরে ধীরে “ইবাদত”-এ রূপান্তরিত হয়।
সহীহ মুসলিম হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ أُمَّ حَبِيبَةَ، وَأُمَّ سَلَمَةَ ذَكَرَتَا كَنِيسَةً رَأَيْنَهَا بِالْحَبَشَةِ فِيهَا تَصَاوِيرُ، فَذَكَرَتَا لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ " إِنَّ أُولَئِكَ إِذَا كَانَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فَمَاتَ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، فَأُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
আম্মা আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন: উম্মে হাবীবা ও উম্মে সালামা (রাঃ) হাবশায় তাঁদের দেখা একটা গির্জার কথা বলেছিলেন, যাতে বেশ কিছু ছবি ছিল। একদা তাঁরা উভয়ে বিষয়টি নবী (ﷺ)-এর নিকট বর্ণনা করলেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মসজিদ বানাতো। আর তার ভিতর ঐ লোকের ছবি তৈরি করে রাখতো। কেয়ামত দিবসে তারাই আল্লাহর নিকট সবচাইতে নিকৃষ্ট সৃষ্টজীব বলে পরিগণিত হবে। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৪২৭, ৪৩৪, ১৩৪১, ৩৮৭৩, সহীহ মুসলিম হাদীস নং ১০৬৮)।
৩. শিরকের প্রকৃত কারণ:
ক. অতিরঞ্জিত ভক্তি: মানুষ যখন সৎ ব্যক্তিদের সম্মান করতে গিয়ে সীমা লঙ্ঘন করে, তখন তা শিরকের দিকে নিয়ে যায়। সুতরাং বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে উম্মতিদের সতর্ক বার্তা দিয়েছেন:
لاَ تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ
তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন ঈসা মারইয়াম (আঃ) সম্পর্কে নাসারা (খ্রিস্টানরা) বাড়াবাড়ি করেছিল। আমি তাঁর বান্দা, তাই তোমরা বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। (সহীহ আল বুখারী হাদীস নং ৩৪৪৫)।
খ. জ্ঞানের অভাব:
প্রথম প্রজন্ম সঠিক উদ্দেশ্য জানত, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম অজ্ঞতার কারণে মূর্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যায়।
গ. শয়তানের প্ররোচনা
শয়তান মানুষকে ধাপে ধাপে বিভ্রান্ত করে—প্রথমে স্মৃতিচিহ্ন, পরে প্রতীক, অবশেষে উপাসনা।
৪. নূহ (আ.)–এর দাওয়াত: শিরকের বিরুদ্ধে প্রথম আন্দোলন। যখন শিরক ব্যাপক আকার ধারণ করে, তখন আল্লাহ তাআলা নূহ আলাইহিস সালাম)–কে প্রথম রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি দীর্ঘ ৯৫০ বছর তাঁর কওমকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন:
وَلَقَد أَرسَلنا نوحًا إِلىٰ قَومِهِ فَلَبِثَ فيهِم أَلفَ سَنَةٍ إِلّا خَمسينَ عامًا فَأَخَذَهُمُ الطّوفانُ وَهُم ظٰلِمونَ،
আমি নূহ (আঃ) কে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছিলাম। তিনি তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিলেন। অতঃপর তাদেরকে মহাপ্লাবণ গ্রাস করেছিল। তারা ছিল পাপী।(সূরা আনকাবূত আয়াত নং:১৪)।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন আরো বলেন:
إِنّا أَرسَلنا نوحًا إِلىٰ قَومِهِ أَن أَنذِر قَومَكَ مِن قَبلِ أَن يَأتِيَهُم عَذابٌ أَليمٌ، قالَ يٰقَومِ إِنّى لَكُم نَذيرٌ مُبينٌ، أَنِ اعبُدُوا اللَّهَ وَاتَّقوهُ وَأَطيعونِ، يَغفِر لَكُم مِن ذُنوبِكُم وَيُؤَخِّركُم إِلىٰ أَجَلٍ مُسَمًّى ۚ إِنَّ أَجَلَ اللَّهِ إِذا جاءَ لا يُؤَخَّرُ ۖ لَو كُنتُم تَعلَمونَ، قالَ رَبِّ إِنّى دَعَوتُ قَومى لَيلًا وَنَهارًا، فَلَم يَزِدهُم دُعاءى إِلّا فِرارًا، وَإِنّى كُلَّما دَعَوتُهُم لِتَغفِرَ لَهُم جَعَلوا أَصٰبِعَهُم فى ءاذانِهِم وَاستَغشَوا ثِيابَهُم وَأَصَرّوا وَاستَكبَرُوا استِكبارًا، ثُمَّ إِنّى دَعَوتُهُم جِهارًا، ثُمَّ إِنّى أَعلَنتُ لَهُم وَأَسرَرتُ لَهُم إِسرارًا، فَقُلتُ استَغفِروا رَبَّكُم إِنَّهُ كانَ غَفّارًا،يُرسِلِ السَّماءَ عَلَيكُم مِدرارًا، وَيُمدِدكُم بِأَموٰلٍ وَبَنينَ وَيَجعَل لَكُم جَنّٰتٍ وَيَجعَل لَكُم أَنهٰرًا، ما لَكُم لا تَرجونَ لِلَّهِ وَقارًا، وَقَد خَلَقَكُم أَطوارًا، أَلَم تَرَوا كَيفَ خَلَقَ اللَّهُ سَبعَ سَمٰوٰتٍ طِباقًا، وَجَعَلَ القَمَرَ فيهِنَّ نورًا وَجَعَلَ الشَّمسَ سِراجًا، وَاللَّهُ أَنبَتَكُم مِنَ الأَرضِ نَباتًا،ثُمَّ يُعيدُكُم فيها وَيُخرِجُكُم إِخراجًا، وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمُ الأَرضَ بِساطًا، لِتَسلُكوا مِنها سُبُلًا فِجاجًا، قالَ نوحٌ رَبِّ إِنَّهُم عَصَونى وَاتَّبَعوا مَن لَم يَزِدهُ مالُهُ وَوَلَدُهُ إِلّا خَسارًا، وَمَكَروا مَكرًا كُبّارًا، وَقالوا لا تَذَرُنَّ ءالِهَتَكُم وَلا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلا سُواعًا وَلا يَغوثَ وَيَعوقَ وَنَسرًا، وَقَد أَضَلّوا كَثيرًا ۖ وَلا تَزِدِ الظّٰلِمينَ إِلّا ضَلٰلًا.
আমি নূহকে প্রেরণ করেছিলাম তাঁর সম্প্রদায়ের প্রতি একথা বলেঃ তুমি তোমার সম্প্রদায়কে সতর্ক কর, তাদের প্রতি মর্মন্তদ শাস্তি আসার আগে। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্যে স্পষ্ট সতর্ককারী। এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহ তা’আলার এবাদত কর, তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আল্লাহ তা’আলা তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলার নির্দিষ্টকাল যখন হবে, তখন অবকাশ দেয়া হবে না, যদি তোমরা তা জানতে! সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা! আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত্রি দাওয়াত দিয়েছি; কিন্তু আমার দাওয়াত তাদের পলায়নকেই বৃদ্ধি করেছে। আমি যতবারই তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, ততবারই তারা কানে অঙ্গুলি দিয়েছে, মুখমন্ডল বস্ত্রাবৃত করেছে, জেদ করেছে এবং খুব ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে। অতঃপর আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়েছি, অতঃপর আমি ঘোষণা সহকারে প্রচার করেছি এবং গোপনে চুপিসারে বলেছি। অতঃপর বলেছিঃ তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর অজস্র বৃষ্টিধারা ছেড়ে দিবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন, তোমাদের জন্যে উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদীনালা প্রবাহিত করবেন।তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহ তা’আলার শ্রেষ্টত্ব আশা করছ না। অথচ তিনি তোমাদেরকে বিভিন্ন রকমে সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ কিভাবে সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। এবং সেখানে চন্দ্রকে রেখেছেন আলোরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন প্রদীপরূপে।
আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে মৃত্তিকা থেকে উদগত করেছেন। অতঃপর তাতে ফিরিয়ে নিবেন এবং আবার পুনরুত্থিত করবেন। আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্যে ভূমিকে করেছেন বিছানা। যাতে তোমরা চলাফেরা কর প্রশস্ত পথে। নূহ বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আমার সম্প্রদায় আমাকে অমান্য করেছে আর অনুসরণ করছে এমন লোককে, যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কেবল তার ক্ষতিই বৃদ্ধি করছে। আর তারা ভয়ানক চক্রান্ত করছে। তারা বলছেঃ তোমরা তোমাদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না ওয়াদ, সূয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নসরকে। অথচ তারা অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে। অতএব আপনি জালেমদের পথভ্রষ্টতাই বাড়িয়ে দিন। (সূরা নূহ আয়াত নং ১-২৪)।
এ থেকে বোঝা যায়—শিরক ছিল মানবজাতির প্রথম ব্যাপক বিভ্রান্তি, আর তাওহীদের দাওয়াত ছিল নবুওয়তের প্রধান লক্ষ্য।
৫. সমকালীন শিক্ষণীয় বিষয়:
১. অতিরঞ্জিত ভক্তি ও ব্যক্তিপূজা শিরকের পথ উন্মুক্ত করে।
২. ইসলামে মূর্তি বা প্রতিকৃতি পূজা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
৩. তাওহীদ রক্ষা করা প্রতিটি মুসলিমের ঈমানি দায়িত্ব।
উপসংহার
পৃথিবীতে শিরকের উৎপত্তি হয়েছিল সৎ ব্যক্তিদের প্রতি অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে। শুরুতে উদ্দেশ্য ছিল স্মরণ, কিন্তু ধীরে ধীরে তা ইবাদতে রূপ নেয়। মানবজাতির ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—তাওহীদের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা ছাড়া মুক্তির আর কোনো পথ নেই।
শিরকের সূচনা যেমন ধীরে ধীরে হয়েছিল, তেমনি তা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, সচেতনতা ও পবিত্র আল কুরআন এবং সুন্নাহর প্রতি দৃঢ় আনুগত্য।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0